মাথা-বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায় পাকিস্তানী সেনার গুলিতে, তবুও একাই ভারতীয় পোস্ট রক্ষা করেন ভারতীয় বীরনায়ক যদুনাথ

সালটা ১৯৪৮। ভারত ও পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর জম্মু-কাশ্মীর আক্রমণ করে পাকিস্তান। ৬ই অক্টোবর সকাল ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ তানধরে ২৭ জনকে নিয়ে নিজের পোস্ট সামলাচ্ছিলেন যদুনাথ সিং।

পাকিস্তানী সেনাদের অকস্মাৎ গুলির জেরে জখম ও মৃত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ভারতীয় সেনা। গুলি লাগে যদুনাথেরও। পোস্ট দখল করার লক্ষ্যে অবিরাম গুলি করতে থাকে পাকিস্তানী সেনারা। দখল করতে উদ্যোগী তানধরের নৌসেরার পোস্ট।

ঠিক সেই সময়ই ভারতীয় পোস্টের দিক থেকে শুরু হল অবিরাম ঝড়ের গতিতে গুলিবর্ষণ। একমাত্র ভারতীয় সেনা বন্ধুক উঠিয়ে তাক করে রয়েছেন পাকিস্তানী সেনাদের দিকে। হ্যাঁ, সেই যদুনাথ সিং। তাঁর গুলিতে ততক্ষণে মাটিতে পড়ে গিয়েছে শত্রুপক্ষের নানান সেনা। সংখ্যায় শতাধিক থাকলেও পাকিস্তানী সেনারা প্রমাদ গুনল। পিছু হঠতে বাধ্য হল তারা।

অন্যান্য ভারতীয় সেনারা যখন সেখানে পৌঁছন, সেই সময় শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছেন রাজপুত রেজিমেন্টের নায়ক যদুনাথ সিং। তাঁর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে শত্রুপক্ষের গুলিতে। মাথায়, বুকে গুলি লাগলেও পোস্ট ছেড়ে যাননি যদুনাথ। সেই অবস্থাতেই লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর জন্যই রক্ষা পায় তানধরের নৌসেরার সেই পোস্ট। তা না হলে তা দখল করে নিত পাকিস্তানীরা। যদুনাথ একাই শত্রুপক্ষকে রুখে দিতে সক্ষম হন।

১৯১৬ সালের ২১শে নভেম্বর উত্তরপ্রদেশের শাহাজাহানপুরের খাজুরি গ্রামে দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যদুনাথ সিংয়ের। তাঁর বাবা ছিলেন বীরবল সিং রাঠৌর ও মা যমুনা কানওয়ার। দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে যদুনাথ ছিলেন তৃতীয়। গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন যদুনাথ। গরীব পরিবারে পড়াশোনা আর বেশিদূর এগোতে পারেননি যদুনাথ।

নাবালক যদুনাথ বাবার সঙ্গে চাষের কাজ করতেন। গ্রামে শরীরচর্চার পরিমণ্ডল ছিল। সেই আবহে বেড়ে ওঠেন যদুনাথ। অল্প বয়সেই শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে শুরু করেন তিনি। নিয়মিত আখড়ায় যেতেন ও চর্চা করতেন। বেশ অল্প বয়সেই নিজের এলাকায় কুস্তিবীর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন যদুনাথ।

ছোটো থেকেই দেশকে সেবা করার স্বপ্ন দেখতেন যদুনাথ। এই কারণে পঁচিশ বছর বয়সে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির সেভেন রাজপুত রেজিমেন্টের ফার্স্ট ব্যাটেলিয়নে যোগ দেন তিনি। ১৯৪২ সালে আরাকান অঞ্চলে জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন যদুনাথ। সেখানে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেখান তিনি। যদুনাথের দলও বীরবিক্রমে লড়াই করে।

এরপর ১৯৪৫ সালে যদুনাথ সিংয়ের ব্যাটেলিয়নকে সেকেন্ড ইন্ডিয়ান ইনফেনটারি ব্রিগেডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয় তাদের। জাপানি জওয়ানদের পিছু হঠতে বাধ্য করেন যদুনাথ ও তাঁর সতীর্থরা। এরপর দেশে ফেরার পর যদুনাথকে নায়েক পদবী দেওয়া হয়। দেশভাগের পর সেভেন রাজপুত রেজিমেন্টকে ইন্ডিয়ান আর্মির অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাঁকে।

১৯৫০ সালে মরণোত্তর পরমবীর চক্র দেওয়া হয় যদুনাথ সিংকে। সেনার তরফে বলা হয়, “অসম সাহসিকতা ও নেতৃত্বে দক্ষতার জন্য যদুনাথ সিংকে পরমবীর চক্র দেওয়া হল। সঙ্গীরা জখম ও শহিদ হলেও তাঁদের ছেড়ে যাননি যদুনাথ।

পোস্টকে রক্ষা করার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। শত্রুপক্ষের দ্বিতীয় আক্রমণে তিনি জখম হয়েছিলেন। তারপরও তিনি লড়াই চালিয়ে যান। তৃতীয় আক্রমণের পর কার্যত একা হাতে পোস্ট সামলেছিলেন। বন্দুক হাতে একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ফলে শত্রুরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। যদুনাথের এই অবদান অবিস্মরণীয় ও অভূতপূর্ব”।

Sharing is caring!

About admin

Check Also

৮ বছরের কষ্টের টাকা বাবাকে পাঠাতেন ছেলে, হিসাব চাওয়ায় বানালেন লাশ

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বাবা-মা ও ভাইয়ের মারধরে প্রবাসী শারফুল ঢালীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মা হোসনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *